জনগণের সচেতনতাই এসব প্রতিরোধ করতে পারে : জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী

জনগণের সচেতনতাই এসব প্রতিরোধ করতে পারে : জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী

শ. ই. সরকার :: বিশিষ্ট জিন বিজ্ঞানী ও পঞ্চব্রীহি ধান আবিস্কারক ড. আবেদ চৌধুরী বলেছেন- দেশে গুণী মানুষের কদর নেই, দূর্বৃত্তরা দেশ চালিয়েছে, হাওর-নদী-পাহাড় সব খেয়ে নিতে চাচ্ছে। জনগণের সচেতনতাই এসব প্রতিরোধ করতে পারে। মৌলভীবাজার জেলার হাওরগুলোতে ফসলের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য হাওর নিয়ে ভাবতে হবে। হাওরের ভূমির উপযোগী ধান উৎপাদন করতে হবে। হারিয়ে যাওয়া মাছ ফিরিয়ে আনতে হবে।
কাউয়াদিঘী হাওর রক্ষা আন্দোলন, মৌলভীবাজার এর আয়োজনে সংগঠনের আহবায়ক আ স ম সালেহ সোহেলের সভাপতিত্বে ও সদস্যসচিব খছরু মিয়া চৌধুরীর সঞ্চালনায় মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের এম সাইফুর রহমান অডিটোরিয়ামে ২৭ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার বিকালে অনুষ্ঠিত ‘হাওরবাসীর সাথে কৃষি ও মৎস্য বিষয়ক মতবিনিময়’ সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আলোচক হিসাবে বক্তব্য রাখেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম এ কাশেম, জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় কুন্ডু, মৌলভীবাজার মহিলা সমিতির সভাপতি ডাঃ দিলশাদ পারভীন চৌধুরী, মৌলভীবাজার বিএমএ’র সাবেক সভাপতি ডা. এম এ আহাদ, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সরওয়ার আহমদ ও সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার গ্রামীন জনকল্যাণ সংসদের সভাপতি জামিল চৌধুরী।
মতবিনিময় সভার অংশীজনেরা বলেন- এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি বাংলাদেশের মিঠাপানির সবচেয়ে বড় আধার এবং নানা প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদে ভরপুর। এ হাওরের ৭০ ভাগের অবস্থান মৌলভীবাজার জেলায়। এককভাবে বৃহত্তর হাওর কাউয়াদিঘীকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘মনু সেচ প্রকল্প’। হাইল হাওরের মৎস্য অভয়ারণ্য, পর্যটকদের প্রিয় বাইক্কা বিল- এ ৩টি বড় হাওরের গর্ভে রয়েছে অনেকগুলো ছোট ছোট হাওর। এছাড়াও হাওরের বৈশিষ্ট্য নিয়ে এখনো টিকে আছে বড় হাওর, কাটাবিলের হাওর, গুলের হাওর, হলদিয়ার হাওর, কেওলাবিলের হাওর, করাইয়ার হাওর, হিংগুয়ার হাওর, বীর গুগালির হাওর, ভুরভুরিয়া হাওর, চাতলা বিলের হাওর, খাইঞ্জার হাওরসহ ছোট-বড় ৩০টির অধিক হাওর। কিন্তু, জলাভূমি ও হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তরের মনগড়া মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়েছে, জেলায় হাওরের সংখ্যা ৩টি। জেলার পানি উন্নয়ন বিভাগ, কৃষি বিভাগ, মৎস্য বিভাগ ও পরিবেশ দপ্তর এগুলো কোনটির হাতেই হাওরগুলোর প্রকৃত সংখ্যা নেই। তাহলে এ ভুল সংখ্যা তারা কোথায় পেলো ? যে হাওরগুলো জেলার ২১ লাখ মানুষের পরিবেশ ভারসাম্যের হৃৎপিণ্ড হিসেবে কাজ করছে এবং মিঠাপানির মাছের চাহিদা পুরণসহ খাদ্যের যোগান দিচ্ছে, সে হাওরগুলো নিয়ে সরকারের আমলা-কামলাদের দায়সাড়া ধরণের দায়িত্ব পালন প্রমাণ করছে আমরা মৌলভীবাজারবাসী উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। জলাভূমি ও হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তরের মনগড়া মাস্টারপ্ল্যানে জেলার হাওরের তালিকা সংশোধন করতে হবে। তা নাহলে হাওরপাড়ের জনগণের উন্নয়ন বৈষম্য রোধ করা যাবেনা। দীর্ঘদিন ধরে আবেদন-নিবেদন সত্তেও মৌলভীবাজারবাসী সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিগত সময়ের অদক্ষ ও লুটেরা রাজনৈতিক নেতৃত্ব এহেন বৈষম্যের সঠিক মোকাবেলায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বে যারা আসবেন, তাঁরা এসব বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে হবে।
কাউয়াদিঘী হাওর রক্ষা আন্দোলন, মৌলভীবাজার এর দাবি-
(১) জেলার ছোট-বড় ৩০টি হাওরকে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়নের হালনাগাদ মাস্টার প্ল্যানের তালিকাভুক্ত করতে হবে।
(২) হাওরের খাল-বিল-ছড়া নদী খনন ও দখলমুক্ত করতে হবে। হাওরের কান্দিগুলোতে/বিলের পাড়ে জলজ বৃক্ষ (হিজল, করচ, জারুল) রূপন করতে হবে।
(৩) মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন বাড়ানো, দেশীয় প্রজাতির মাছ বাঁচানো, মাছের অভয়াশ্রম বাধ্যতামূলক করা, অনতিবিলম্বে কাউয়াদিঘী হাওরের ৪২টি বিলের মধ্যে ‘হাওয়া বিলকে’ অভয়াশ্রম ঘোষণা করা ও অন্যান্য বিলের মাছ আহরণে লুটেরা লীজ প্রথা বাতিল করে লাইসেন্স প্রথা চালু করতে হবে।
(৪) হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশ, প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য বিনাশ করে এমন স্থানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন/শিল্পায়ন করা যাবেনা।
(৫) মনু সেচ প্রকল্পভূক্ত কাউয়াদিঘী হাওরে নদী থেকে হাওরে মাছের অবাধ (আগের মতো) প্রবেশের জন্য কুশিয়ারা নদীর বেড়িবাঁধে ৪টি ও মনু নদীর বেড়িবাঁধে ২টি ‘ফিসপাস গেইট’ নির্মাণ করতে হবে।
(৬) কৃষিজ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে মনু সেচ প্রকল্পের পরিবেশ সহায়ক বিজ্ঞান সম্মত আধুনিকায়ন/ সংস্কারসহ হাওরের পানির মৌসুম ভিত্তিক লেভেল নির্ধারণ করে (ক) কৃষক-মৎস্যজীবী প্রতিনিধি নিয়ে (হাওর পাড়ের ৩৭টি গ্রাম/পাড়া থেকে অনূন্য ৫ জন করে) পানি ব্যবস্থাপনা এবং (খ) ভূমির ধরণ অনুযায়ী পঞ্চব্রীহি, চতুর্ব্রীহি, ত্রি-ব্রীহি, দ্বি-ব্রীহি ধান ও সবজি চাষের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
(৭) হাওর এলাকায় যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হাওর নিয়ে কাজ করে এমন দপ্তর/পরিদপ্তর সমূহের সমন্বিত পরিকল্পনা থাকতে হবে। বর্ষা মৌসুমে হাওরের পানিপ্রবাহ বাঁধাগ্রস্থ করে বন্যার সৃষ্টি হয় ও মাছের অবাধ বিচরণে বিঘ্ন ঘটে এমন প্রকল্প গ্রহণ করা যাবেনা।
(৮) হাওরের রাস্তায় নির্মিত নিচু কালভার্ট/ব্রীজ (যেগুলোর নীচ দিয়ে বর্ষায় নৌকা চলাচল করতে পারেনা) এমন কালভার্ট/সেতু অপসারণ করে পুণঃনির্মাণ করতে হবে।
(৯) কাউয়াদিঘী হাওরের নলুয়া ছড়া, কাংলা, লাছ, মাছুখালি, ধলিধরা ছড়া লীজ দেয়া বন্ধ করতে হবে। গোয়ালী খাড়ায় স্লুইসগেট নির্মাণ করতে হবে এবং কৃষকদেরকে বিনামূল্যে সার-বীজ-কীটনাশক দিতে হবে।
মতবিনিময় সভায় বক্তারা এ ৯ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত হবার জন্য দল-মত নির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহবান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *