বিনা কারণে মেঘনা আলমকে আটক রেখে রাষ্ট্র যে বেপরোয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করছে, তা উদ্বেগজনক

বিনা কারণে মেঘনা আলমকে আটক রেখে রাষ্ট্র যে বেপরোয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করছে, তা উদ্বেগজনক

সুরমার ঢেউ সংবাদ :: মডেল ও মিস আর্থ বাংলাদেশ ২০২০ মেঘনা আলমকে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়ার নিন্দা জানিয়ে এ ঘটনার বিচার দাবি করেছে ‘নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীরা’ সংগঠন। সংগঠনটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ১৮ এপ্রিল শুক্রবার এ দাবি জানায়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘পরিবর্তন যতই হোক না কেন, অনেক কিছুই একই থেকে যায়। ফ্যাসিস্ট কৌশলের প্রতিধ্বনিতে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা ৯ এপ্রিল মিস আর্থ বাংলাদেশ ২০২০, মেঘনা আলমের বাসায় ঢুকে তাকে অপহরণ করে। তারা তার বিরুদ্ধে কোনো ওয়ারেন্ট দেখায়নি বা নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগও আনেনি। ঘটনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণকারী ও উদ্বিগ্ন নারীবাদী সংগঠন হিসেবে, ”নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীরা” এ ঘটনার বিচার দাবি করে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করছে।’
এতে আরও বলা হয়, ‘ফেসবুক লাইভ ভিডিওতে দেখা যায় যে, সাদা পোশাকধারী নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা তার অনুমতি ছাড়াই তার বাসায় ঢুকে পড়ে। এর পরপরই নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীরার সদস্যরা ভাটারা থানা ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাথে যোগাযোগ করে তার অবস্থান জানার চেষ্টা করে। কিন্তু, তারা বাধা ও গড়িমসি ছাড়া কিছুই পায়নি। মেঘনা আলম নিখোঁজ হবার ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পর এবং সংগঠনের একটানা চাপের ফলে, তাকে ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ১টার দিকে আদালতে হাজির করা হয় এবং মুজিব আমলের বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর আওতায় ৩০ দিনের জন্য কারাগারে পাঠানো হয়।’
‘আমরা আরও জানতে পেরেছি যে, একজন সৌদি কূটনীতিক তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন।আমাদের জোরালো প্রচারাভিযান, অন্যান্য মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজ সংগঠন এবং গণমাধ্যমের দৃষ্টির কারণে, ১৩ এপ্রিল হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে সরকারের কাছে জানতে চায়, কেন এসপিএ আইনের আওতায় মেঘনা আলমের আটককে অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। কিন্তু, ১৭ এপ্রিল তাকে ধানমন্ডি থানায় দায়ের একটি নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে- যেখানে তাকে চাঁদাবাজি, প্রতারণা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য হুমকি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ নতুন উন্নয়ন প্রাথমিক রাষ্ট্রীয় আচরণকে বৈধতা দেয় না’, ‍সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যোগ করা হয়।
আমরা আবারও বলছি- এটি আবারও প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষমতাধরদের সেবা দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, আইনের নামে নিপীড়ন চালাচ্ছে এবং সরকারের লোকজনের পক্ষ থেকে আসা দুঃখজনক অজুহাতের আশ্রয় নিচ্ছে। সরকার ভয়ভীতি, বিভ্রান্তি, মিথ্যা তথ্য, চরিত্র হনন, নারী বিদ্বেষপূর্ণ ইঙ্গিত ব্যবহার করে মানবিক আচরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে এবং ওয়ারেন্ট ছাড়াই একজন নারীর বাসায় প্রবেশ করে তাকে অপহরণ করার ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে। মুজিব আমলের বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে ও বিনা কারণে আটক রেখে রাষ্ট্র যে অমানবিক ও বেপরোয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’
‘নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীরা’ বলে, ‘আমরা গভীরভাবে প্রশ্ন করি, কেন কেবল প্রবল সমালোচনার মুখে আইন উপদেষ্টা স্বীকার করেছেন যে, মেঘনা আলমের আটক আইনানুগ ছিল না। অথচ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এ ঘটনাকে আইনসম্মত বলে রক্ষা করেছেন। আমরা আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ্য করি যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিভ্রান্তি, অজুহাত, প্রক্রিয়াগত বাধা এবং সর্বোপরি নারী বিদ্বেষ যেন একটি ধারাবাহিক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে- যেখানে রাষ্ট্র সাহায্য না করে দুর্বলদের হয়রানি করতে বেশি আগ্রহী।
‘নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীরা’ এ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রকে কঠোরভাবে নিন্দা জানায় এবং তার সমস্ত অজুহাত ও ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে। তারা যেভাবে “সর্বজনীন শান্তি বিনষ্ট,” “জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি,” “কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি” ইত্যাদি অস্পষ্ট ও খেয়ালী ভাষায় আইনি অজুহাত দিচ্ছে, তা রাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রকাশ করে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রাথমিক বিবৃতিতে “জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি” এ কথাও বলা হয়েছে। আমরা জানতে চাই, কেন ? কী প্রেক্ষিতে ? রাষ্ট্র কি সৌদি কূটনীতিকের প্রতিশোধমূলক হুমকির সামনে নত হয়েছে ? সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
এতে আরও বলা হয়, ‘ডিএমপির বিবৃতিতে বলা হয়েছে মেঘনা আলম নিরাপদ হেফাজতে আছেন। তারা কি জানে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে হেফাজতের আবেদন না করে, তাহলে আইন অনুযায়ী এমন হেফাজতের সুযোগ নেই ? আমরা প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের শেয়ার করা প্রাথমিক ব্যাখ্যাও প্রত্যাখ্যান করি, যেখানে বলা হয়েছে “সব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।”‘
‘আমরা সর্বশক্তি দিয়ে এ অন্যায্য ও ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ- ওয়ারেন্ট ছাড়া কারো বাড়িতে প্রবেশ করে অপহরণ, তার অবস্থান অস্বীকার করা, একেবারে পেছনে ফিরে ফ্যাসিস্ট আইন প্রয়োগ করে তার অপহরণকে বৈধতা দেয়া, অভিযোগ ছাড়াই আটক, অস্পষ্ট ও অন্যায্য অজুহাতে আটক রাখা, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি, নিখোঁজ করার চেষ্টা, প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা (যেমন- তার বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা সরিয়ে ফেলা এবং ফেসবুক লাইভ মুছে ফেলা), চরিত্র হনন, নারী বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য ও ইঙ্গিত, একজন বিদেশি কূটনীতিকের চাপ এবং অপরাধ প্রমাণের আগেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সাজানোর প্রচেষ্টা- এ সবকিছুরই আমরা কড়াভাবে নিন্দা করি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি আরও বলে, ‘রাষ্ট্র কাউকে ওয়ারেন্ট ছাড়া আটক করতে পারে না, আইনি সহায়তা না দিয়ে আটক রেখে তার বিরুদ্ধে মামলা সাজাতে পারে না, এসব একটি অগণতান্ত্রিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন রাষ্ট্রের লক্ষণ- যা মনে করে জোর-জবরদস্তির অস্ত্র দিয়ে আইনকে রূপান্তর করলেই তা বিচার হয়ে যায়। আমরা বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ সব অন্যায্য আইন বাতিলের দাবি জানাই, এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে (শুধু ডিবি প্রধান নয়) তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানাই এবং মেঘনা আলমকে রাষ্ট্রীয় ভয়ভীতি ও আইনি হয়রানি থেকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানাই। আমরা সে রাষ্ট্রচর্চা প্রত্যাখ্যান করি- যা আইনের অপব্যবহার করে একটি ভয়ের, প্রতারণার ফাঁদ পাতার ও বিভ্রান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীরার পক্ষে সই করেন মানবাধিকার আইনজীবী ও অধিকারকর্মী ব্যারিস্টার তাবাসসুম মেহেনাজ, ইশরাত জাহান প্রাচী, লেখক ও গবেষক পারসা সানজানা সাজিদ এবং নৃবিজ্ঞানী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নাসরিন সিরাজ। (সূত্র : The Daily Star বাংলা অনলাইন)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *