সুরমার ঢেউ সংবাদ :: দেশে দায়িত্ব পালণ করতে গিয়ে ২০২৫ সালে হামলায় আহত হয়েছেন ৬০১ পুলিশ। সে হিসাবে প্রতিমাসে আহতের সংখ্যা ৫০ জন। প্রতিদিন হামলার শিকার হয়েছেন ১.৭ জন। মাঠ পর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি চলমান ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে উচ্ছৃঙ্খল জনতার দলবদ্ধ হামলায় তারা আহত হয়েছেন। এসব তথ্য জানা যায় পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে। (দৈনিক কালের কণ্ঠ)
পুলিশের ওপর এসব হামলার ঘটনার তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে জানা গেছে- বেশির ভাগ পুলিশ ‘মব’ সন্ত্রাসের শিকার হয়ে আহত হয়েছেন। অনেক পুলিশ শারীরিকভাবে গুরুতর জখম হন। আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থেকে অনেকে মারাও গেছেন। তবে, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি।
১৩ জানুয়ারী মঙ্গলবার ময়মনসিংহের দিগরকান্দা ফিশারি মোড় এলাকায় আসামি ধরতে গিয়ে বিকেল ৪টার দিকে একদল হামলাকারী কুপিয়ে ৫ পুলিশকে আহত করে হাতকড়াসহ আরিফুল ইসলাম নামে এক আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। হামলায় আহত পুলিশরা ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানার শতাধিক পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে- আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোর মধ্যে পুলিশ সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে ৫ আগস্ট। এখন অভিযানে গেলেই পুলিশরা প্রায়ই হামলার শিকার হচ্ছেন। এতে তাঁদের মনোবল স্বাভাবিক থাকছে না। বিশেষ করে ‘মব’ সন্ত্রাস চালিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন- পুলিশ আইনের রক্ষক। তারাই যদি হামলার শিকার হয়, তাহলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে ?
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী- হামলায় মহানগর পুলিশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আহত হন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৮৯ জন। এ হিসাবে রেঞ্জ পুলিশের মধ্যে ঢাকা রেঞ্জ পুলিশ বেশি আহত হয়। গত ১০ জানুয়ারি পটুয়াখালী সদর উপজেলার লাউকাঠিতে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বরগুনা ডিএসবিতে কর্মরত শহিদুল ইসলাম নামের এক পুলিশ গুরুতর আহত হন। একই হামলায় তাঁর ছোটভাই কারা পুলিশ আনিছুর রহমান মনিরও আহত হন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী- দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে হামলায় ৬০১ জন পুলিশ আহত হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারী মাসে ৩৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭, মার্চে ৯৬, এপ্রিলে ৫২, মে মাসে ৬২, জুনে ৪৪, জুলাইয়ে ৩৯, আগস্টে ৫১, সেপ্টেম্বরে ৪৩, অক্টোবরে ৬৯, নভেম্বরে ৪১ ও ডিসেম্বরে ২৯ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
ডিএমপি সূত্র বলছে- গতবছর বিভিন্ন সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় অন্তত ৩০ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেয়া হয়। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ৮৯ জন পুলিশ আহত হন। এ হিসাবে প্রতিমাসে ডিএমপিতে ৭ জনের বেশি পুলিশ আহত হন। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের কাছ থেকে ১০ জন আসামিকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। এভাবে সারা দেশে ৪৪টির বেশি হামলার ঘটনায় অন্তত ৪১ জন আসামিকে ছিনিয়ে নেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন- ‘দেশে বিভিন্ন জায়গায় আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয় পুলিশ। তাই, নাগরিক সমাজের প্রতি অনুরোধ, আপনারা পুলিশকে আবার কাছে টেনে নিন। কাজ করতে সহায়তা করুন। মানুষের কাছে পুলিশকে আবার গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে জানিয়ে আইজিপি বলেন, ‘পুলিশকে আবার কর্মক্ষম করে তোলার পাশাপাশি আবার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা চলছে।
মনোবল ফেরাতে যেসব উদ্যোগ :
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে- পুলিশের মনোবল ফেরাতে সরকার ও পুলিশ সদর দপ্তর এর মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আন্দোলনে নিহত পুলিশ সদস্যদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেয়ার পাশাপাশি আহত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। মহানগর ও জেলার ইউনিট প্রধানরা মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। তাঁদের কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিয়ে যাচ্ছেন। হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে পুলিশ সদস্যদেরকে কাজে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, যাতে আগামী নির্বাচনে তাঁরা সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্য পালিয়ে গেছেন, তাঁদের অনেকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অনেক কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে। অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ও চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
সংস্কারের উদ্যোগ :
পুলিশ বাহিনীকে আরো গতিশীল এবং কার্যকর ও জনবান্ধব করতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করার পর বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছে তারা। বাস্তবায়নের কাজও চলছে। ১৮৬১ সালের পুরনো পুলিশ আইন যুগোপযোগী করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেয় সরকার। পুলিশের স্বাভাবিকতা বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং উন্নত দেশের আদলে পুলিশ বাহিনীকে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
পুলিশের ওপর হামলার কয়েকটি ঘটনা :
গত বছর ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় পুলিশের তিন উপপরিদর্শকসহ (এসআই) চার পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন আফজালুর রশিদ, জসীমউদ্দীন, খোরশেদ আলম ও সোহেল। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ীতে মাদক মামলার আসামি ফরিদকে আটক করে গাড়িতে তোলার সময় গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবির ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে ছিনিয়ে নেয় তাঁর পরিবারের সদস্যরা। এ হামলায় এসআই ওয়াহিদুল আহত হন।
৬ জানুয়ারি রাতে ভোলার বোরহানউদ্দিনে পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে ধরতে গিয়ে হামলায় গুরুতর আহত হন এএসআই আলমাস ও নুরুল ইসলাম। ১৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানা এলকায় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে অস্ত্র ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ও পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। এর আগে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে বলা হয়, একটি কুচক্রী মহল সুপরিকল্পিতভাবে পুলিশের মনোবল দুর্বল করার নিমিত্তে ইউনিফর্মধারী পুলিশকে পেশাগত কাজে বাধা দেওয়া এবং শারীরিকভাব লাঞ্ছিত করার এসব ঘটনা ঘটিয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন- পুলিশ সব সময় নিষ্ক্রিয় থাকুক, তা চায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা। রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে ছিনতাইকারী, ফেরারি আসামি ও মাদক ব্যবসায়ীরাও যখন পুলিশের ওপর হামলা চালায়, তখন এটি উদ্বেগের বিষয়। দেশ ও দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণ ও শান্তির কথা বিবেচনা করে রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আইন প্রয়োগে পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে।

