মৌলভীবাজারে তমদ্দুন মজলিসের ৭৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

মৌলভীবাজারে তমদ্দুন মজলিসের ৭৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

সুরমার ঢেউ সংবাদ :: মৌলভীবাজারে তমদ্দুন মজলিসের ৭৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়েছে ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর। এ উপলক্ষ্যে তমদ্দুন মজলিস মৌলভীবাজার জেলা শাখার আয়োজনে তমদ্দুন মজলিস মৌলভীবাজার এর সভাপতি সৈয়দ কামাল আহমদ বাবুর সভাপতিত্বে ও খিজির মুহাম্মদ জুলফিকারের সঞ্চালনায় মৌলভীবাজার পাবলিক লাইব্রেরীর ড. সৈয়দ মুজতবা আলী মিলনায়তনে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে আলোচনা সভা শুরু হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মৌলভীবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. ফয়জুল করিম ময়ূন। প্রধান বক্তা ছিলেন অধ্যাপক আসআদ উল্লাহ। বিশেষ অতিথি ছিলেন ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামান পর্ষদের উপদেষ্টা সিনিয়র সিটিজেন সিরাজুল ইসলাম সিদ্দিকী ও জালালাবাদ ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ পরিষদ মৌলভীবাজার এর সাধারণ সম্পাদক বাবুল উদ্দিন খান। আলোচনায় অংশ নেন আব্দুল বাছিত চৌধুরী, এম মুহিবুর রহমান, ফাতেমা জহুরা, হেনা চৌধুরী, দিলারা বেগম, মেরাজ চৌধুরী, আব্দুস সালাম, মুর্শেদ মুন্না, জহির খান, মহসিন খান, আশরাফুল আলম শিপন, মসহুদুর রহমান মসু প্রমূখ। অলোচনা সভায় সংগঠনটির ঐতিহাসিক ভূমিকা, ভাষা আন্দোলনে অবদান, জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসার এবং বর্তমান সময়ে এর কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান অতিথি সাবেক মেয়র মো. ফয়জুল করিম ময়ূন বলেন, তমদ্দুন মজলিসকে শুধু একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুনের বিকাশের পাশাপাশি শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সংগঠনটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বের ইতিহাসে তমদ্দুন মজলিসের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সংগঠনের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ ? শীর্ষক পুস্তিকা ভাষার প্রশ্নে তৎকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অধ্যাপক আবুল কাসেম সম্পাদিত এ পুস্তিকায় কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ ও আবুল কাসেম বাংলা ভাষার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম, আদালত ও প্রশাসনের ভাষা এবং পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি এতে উত্থাপন করা হয়।
প্রধান বক্তা অধ্যাপক আসআদ উল্লাহ বলেন, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগ পরবর্তীকালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রেও সংগঠনটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তমদ্দুন মজলিসের ঐতিহ্য ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুনের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার সমন্বয়ে ন্যায় ভিত্তিক সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপরও সংগঠনটি গুরুত্ব আরোপ করে।
বিশেষ অতিথি বাবুল উদ্দিন খান বলেন, প্রতিষ্ঠার পর তমদ্দুন মজলিস শুধু প্রচার-প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বই, পুস্তিকা ও বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও চিন্তার প্রসারে ভূমিকা রেখেছে। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে সংগঠনটির ঐতিহাসিক অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তমদ্দুন মজলিসের মূল ঐতিহ্যকে কেবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক চেতনাকে গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
বিশেষ অতিথি সিরাজুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, তমদ্দুন মজলিসের ইতিহাস বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সংগঠনটির অবদান নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি সংগঠনের ঐতিহ্য ধারণ করে সমকালীন সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মসূচি সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
সভাপতির সৈয়দ কামাল আহমদ বাবু বলেন, ৭৯ বছর আগে যে লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে তমদ্দুন মজলিসের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন এলেও জ্ঞান, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশে সংগঠনটির প্রয়োজনীয়তা এখনও রয়েছে। ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। আলোচনায় সকল বক্তা তমদ্দুন মজলিসের দীর্ঘ পথচলা ও ঐতিহাসিক অবদান স্মরণ করে ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুন, জ্ঞানচর্চা, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সংগঠনের কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *