যুক্তরাজ্যে নেয়ার কথা বলে সাড়ে ১৫ লক্ষ টাকা নিয়ে লাপাত্তা সাইদুল

যুক্তরাজ্যে নেয়ার কথা বলে সাড়ে ১৫ লক্ষ টাকা নিয়ে লাপাত্তা সাইদুল

শ. ই. সরকার (জবলু) :: মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ ইউনিয়নের কেশরপাড়ের মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস (হাসান) এর স্ত্রী’কে যুক্তরাজ্যে নেয়ার কথা বলে ১৫ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাইদুল ইসলাম এর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত সাইদুল ইসলাম সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বাঘমারা গ্রামের মৃত গফুর মিয়ার ছেলে (সাবেক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মিসবাউদ্দোজার চাচাতো ভাই)।
ভুক্তভোগী, স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সাইদুল ইসলাম ওআইটিসি প্রোগ্রামের জন্য মোঃ আব্দুল কুদ্দুস (হাসান) এর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। হাসান শরীফ নামে এক বন্ধু’র মধ্যস্থতায় সাইদুলকে ৫০ হাজার টাকা দেন। টাকা নেয়ার পর তিনি জানান পরীক্ষা হবে ও রেজাল্ট আসবে। কিন্তু, পরবর্তীতে ফলাফল না দিয়ে নানা অজুহাত দেখিয়ে টাকা ফেরত দেননি। এদিকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে গোপনে সাইদুল ইসলাম স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে চলে যান। সাইদুল ৫০ হাজার টাকা না দিয়ে নানা টালবাহানার এক পর্যায়ে ২০২৪ সালে শর্ট টার্ম স্টুডেন্ট ভিসার জন্য নতুন করে চুক্তি করেন। শর্ত ছিল ভিসা না হলে টাকা ফেরত দিবেন। শর্ট টার্ম স্টুডেন্ট ভিসার জন্য ২০২৪ সালের মে মাসে সুফিয়া বেগম, ফয়ছল আহমদ, ছায়ারুন নেছা ও হাবিবার মাধ্যমে সাইদুলের প্রদানকৃত ইউসিবি ব্যাংকের ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ নামে একাউন্টে (একাউন্ট নং ০০৬২১১২০০০০০৭০৭৮) আরও ৯ হাজার ৫’শ পাউন্ড প্রদান করেন। অভিযুক্ত সাইদুল ইসলাম ২০২৪ সালের ২০ মে প্রথমবার কেস লেটার দেন। পরে নানা অজুহাতে সেই কেস লেটার এর মেয়াদ পার হয়ে যায়। এরপর ১৯ জুন আবার নতুন করে কেস লেটার আনেন।
১৭ জুলাই ২০২৪ বাংলাদেশে অবস্থিত ইউকে এম্বাসিতে ইন্টারভিউ দিতে যান। কিন্তু আগস্টে হোম অফিস তার ভিসা রিজেক্ট করে। এরপর সাইদুল ইসলাম জানান তিন সপ্তাহের মধ্যে টাকা ফেরত দিবেন। কিন্তু এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত টাকা ফেরত দেননি। এরপর একাধিকবার তারিখ পরিবর্তন করে হাসান ও তার পরিবারের সদস্যদের ঘুরাচ্ছেন। পরবর্তীতে তার চাচাতো ভাই, সাবেক ফেঞ্চুগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজার মাধ্যমে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, সাইদুল বলেছে যেহেতু বিষয়টা এমরান আহমদ চৌধুরীর কাছে চলে গেছে, তাই এমরান সাহেবই শেষ করবেন। এমরান সাহেবও চেষ্টা করেন, কিন্তু এক প্রকার ব্যর্থ হন। তার ভাই সৌদি আরব প্রবাসী সাইফুল ইসলামও একাধিকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
জানা যায়, সাইদুল ইসলাম ২০০৭ সালে ডেকাপুর (মুসলিমাবাদ) মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করেন। এরপর সিলেট জামেয়া থেকে আলিম এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম থেকে অনার্স সম্পন্ন করেন। তিনি কিছুদিন বেড়কুড়ি হাই স্কুলে খন্ডখালিন শিক্ষকতা করেন এবং পরে ফেঞ্চুগঞ্জে ফরিদপুর জামেয়ায় শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ছোট বেলায় তার পিতা-মাতা মারা গেলে সাইদুল আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়েন। পরবর্তীতে চাচাতো ভাই ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় পড়ালেখা চালিয়ে যান। এক পর্যায়ে সাইদুল তার চাচাতো ভাই, সাবেক চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজার সময়ে পাসপোর্ট, নাম পরিবর্তন, জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র এর কাজ করতেন। এসব অবৈধ কাজ করে তিনি বেশ টাকার মালিক হন- যা এলাকার সবাই জানেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি অবৈধ ডলার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন এবং সেই কারণে কিছুদিন জেল খাটেন। তার বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানায় প্রতারণার মামলা রয়েছে এবং তিনি ৬ মাসের অধিক সময় চট্টগ্রাম কারাগারে আটক ছিলেন।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাইদুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেন, “কুদ্দুছ আমার পরিচিত লন্ডনের একটি এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করেছে। আমি কথা বলে দিয়েছি। আমার সাথে টাকা লেনদেনের কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবে না। তবে, আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করে ছিলাম ভিসা না হলে আমি টাকা ফেরত দেব। একপর্যায়ে তিনি বলেন, এ নিয়ে কুদ্দুছ এর সাথে আমার কথাকাটাকাটি বাকবিতন্ডা হয়েছে। সে আমার আত্মীয় স্বজনসহ বিভিন্ন জায়গায় বিচার দিয়েছে। পরবর্তীতে আমি ভার্সিটিতে গিয়ে জানতে পারলাম কুদ্দুছ এর স্ত্রী সুফিয়া আক্তার সরাসরি ভার্সিটিতে যোগাযোগ করে টিউশন ফি ফেরত এনেছেন।
ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস (হাসান) প্রতিবেদককে বলেন, “প্রতারক সাইদুল আমার পূর্ব পরিচিত এজন্য আমি ভিসার জন্য তার কাছে টাকা দেই। সে বলছিল ভিসা না হলে ৩ সপ্তাহের মধ্যে টাকা ফেরত দেব। গতবছরের ডিসেম্বরে যখন নিশ্চিত হলাম ভিসা হচ্ছে না, তখন সে আমাকে অফার করে ভিজিট ভিসা প্রসেসিং করার জন্য। কিন্তু, আমি রাজি হইনি। তার কাছে টাকা চাইলে সে একসপ্তাহ সময় নেয়। একসপ্তাহ পরে সে নানা টালবাহানা করে এবং বলে তুমি টাকার বিষয় নিয়ে আমার আত্মীয়দের কাছে বিচার দিয়েছ এজন্য আমি তোমার টাকা দেব না। আমি যখন লোক লাগালাম তখন সে বলে, আমি টাকা দেব তবে আমাকে সময় দিতে হবে। কিন্তু, আজ পর্যন্ত টাকা পাইনি। সম্প্রতি সাইদুল মানুষের কাছে বলছে আমার টাকা পরিশোধ করেছে। কিন্তু, কারো কাছে পরিশোধের কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি।
পাসপোর্ট গ্রহণকারী মুমিন বলেন, “আমার কাছে শুধু পাসপোর্ট দেয়া হয়েছে। আমার মাধ্যমে টাকার লেনদেন হয়নি। তবে, এ বিষয়টা ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমীরসহ অনেকেই জানেন।
হাসান শরীফ বলেন, ওআইটিসি প্রোগ্রামের জন্য কুদ্দুস সাইদুলকে ৫০ হাজার টাকা দেবে সেটা জানতাম। তবে, আমার মাধ্যমে কোনো লেনদেন হয়নি।
এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, “দু’জনের দুই ধরনের বক্তব্য। এটা সমাধান করতে হলে উভয়কে নিয়ে বসতে হবে। সমাধানের জন্য দু’পক্ষের মুরব্বিদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু, এরপর কেউ কিছু জানাননি। একপর্যায়ে আমি কুদ্দুছের ভাই জাহাঙ্গীরকে বলেছি আইনের আশ্রয় নেয়ার জন্য”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *